চট্টগ্রামের পথে প্রান্তরে
ভোর সকাল। ভীরুভাবে ফুটছে আলো। কুয়াশা জড়ানো শহর৷ এমন কুয়াশা যে, কিছুটা দূরের জিনিসও ঠাওর করা যাচ্ছে না ঠিকমতো।
জিইসি মোড়ের সদাচঞ্চল রূপ তখন একেবারেই বিপরীত। ঝুপঝাপ ঝাড়ু মেরে মানুষগুলো শহরের বাসি আবর্জনা ঠেঙাতে কোমর বাধছে কেবল। চোখ মুছতে মুছতে ঘুম জড়ানো চোখে একটা ব্যস্ত দিনের সূচনা করতে যাচ্ছে কেউ। আমাদের দেখে চটক দিয়ে পালাচ্ছে ঘুম৷ এমন কুয়াশাভরা আরামঘুমের দিনে এ কোন পাগলের আমদানী! হাহ হাহ হা...
এমনিতেই এসব পথে হেঁটে অভ্যাস নেই; তার উপর ভোর আর কুয়াশায় চেনা রাস্তাগুলোও অচেনা ঠেকছে। জ্যাম-জটবিহীন— বলা ভাল, গাড়িবিহীন ঘুমন্ত শহরের রাস্তা ধরে কুয়াশা ভেদ করে হাঁটছি। নার্সারি পেরিয়ে ওয়াশা পৌঁছতে সময় লাগলো না। ওয়াশার মোড়ে পৌঁছে ঘোড়সওয়ারি মূর্তিটার কাছে পৌঁছলে সোজা পথের বদলে বাঁয়ের রাস্তাটা নিতে মন চাইলো। কিছুদূর যেতেই পেলাম আলমাস সিনেমা হল। আর কিছুদূর হাঁটতেই ঘুমন্ত কাজির দেউড়ী এসে পৌঁছালাম। এমন সদাচঞ্চল, হৈ হুল্লোড় আর মানুষে পরিপূর্ণ জীবন্ত জায়গাগুলো এমন স্নিগ্ধ হয়ে থাকতে পারে, এ আমার ধারণার বাইরে ছিল। চিরচেনা কাজির দেউড়ির আড্ডা এলাকাগুলোয় তখনও বাসি আড্ডার চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কয়েকঘণ্টার বিশ্রাম শুধু; এরপর আবার মুখরিত হবার জন্য প্রস্তুত হতে হবে তাকে।
স্নিগ্ধ কাজির দেউড়ির বন্ধ রেস্তোরাঁগুলো পাশ কাটিয়ে সিআরবি পৌঁছে গেলাম৷ সব জায়গাগুলোর মতো এর রূপও অন্য। মানে বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এর যা কিছু রূপ দেখা যায়, তার মতো ব্যস্ত নয়, কিন্তু সে অন্যরকম ব্যস্ত। এই সময়ে সিআরবি গেলে আপনি হতাশায় ভুগতে বাধ্য (যদি আমার মতো হয়ে থাকেন আরকি!)।
শীরিষতলা, সাত রাস্তার মোড় বা বক্ষব্যাধি হাসপাতাল চত্বর, প্রতিটা মোড়ে মানুষ; এই সাতসক্কালবেলা! যে যার মতো ব্যস্ত। কেউ হাঁটছে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে, কেউ দৌড়াচ্ছে হালকা গতিতে, কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, একপাশে মেয়েদের বাইক চালানো শেখাতেও দেখা গেছে, কেউ দল-বলসহকারে ফ্রি হ্যান্ড কসরত করছে, মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে, কিংবা একদল মেয়ে মিলে হচ্ছে মার্শাল আর্ট অনুশীলন!
এত এতসব ভিন্নতা কেবল এই একটাই জায়গার মোড় ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পাবেন আপনি! শরীরের জড়তা তখন কর্পূরের মতো উবে যাবে। মনে উদ্দম আসবে। সত্যি বলতে এই একটা জায়গা আছে, যাকে দেখে আমি ক্লান্ত হইনি আজ পর্যন্ত। অবারিত শান্তি, রূপ আর ভিন্নতা মেলে ধরে বসে আছে সে।
সেখানটা পুরো ঘুরে শেষে কদমতলী দিয়ে বেরোলাম। এত কাছে এসে আমার চিরচেনা নস্টালজিয়ায় ভরপুর স্টেশনে যাব না, এ হতে পারে না। বহু-বহুদিন যাবত ট্রেনে চেপে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়া হয় না। একটা সময়ের ব্যস্তসমস্ত জায়গাটা আজ নিস্তব্ধ পড়ে আছে৷ সে সকাল বলে নয়। করোনার প্রকোপে।
অপেক্ষমান ট্রেন নেই, যখন তখন মাইকিং নেই, ব্যাগ হিঁচড়ে দৌড়ানো মানুষ নেই। শুধু আছে থম ধরা কুয়াশা, তাকে সরিয়ে তার ফাঁক গলে উঁকি দেয়া সোনালী সূর্য আর ঠান্ডা হিরহিরে বাতাস, যা কিনা জোড় চেষ্টা চালাচ্ছিল আমাদের জমিয়ে দেওয়ার; কিন্তু এই এতটা পথ হাঁটা পথিকের কাছে তার হার না মেনে উপায় ছিল না।
এরমধ্যে খাওয়ার কথা কারো আর মাথায় আসেনি; সকালের ব্যাপারটাই আলাদা কিনা। স্টেশন থেকে বেরিয়ে নিউ মার্কেট এলাকার একটা দোকান থেকে তাই কিছু খাবার কিনে নিলাম। এবার উদ্দেশ্য কর্ণফুলীর পাড়ে যাওয়া। ততক্ষণে রোদ উঠে গেছে পুরোদমে। অভয়মিত্র ঘাট পৌঁছে বসলাম। ধু-ধু বালু চারদিকে। একেকটা গাড়ি যাচ্ছে আর আমাদেরকে রাঙিয়ে, খাইয়ে ভরপুর করে তুলছে। যতদ্রুত সম্ভব পথটা পেরিয়ে পাকা ঘাটে গেলাম। তার অবস্থাও খুব একটা মনোরম নয়, তবে রাস্তার আদর-আপ্যায়নের চেয়ে ভাল।
মানুষজন তেমন একটা নেই। জাহাজ কিছু ভিড়ে আছে, দুয়েকজন মাঝি নৌকা নামিয়েছে। আমাদের দিককার ঘাটে কেউ নেই; যেহেতু এটা আনন্দভ্রমণের সময় নয়!
শুধু খাওয়ার সময়টুকু কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঠাঁ-ঠাঁ রোদ তখন। এবার বেরিয়ে হাঁটায় বিরতি দিলাম। রিক্সা নিয়ে চলে গেলাম চেরাগি পাহাড় মোড়ে। উদ্দেশ্য চট্টগ্রামে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, আমার দ্বিতীয় বাড়ি বাতিঘরে যাব। লোকজনে বেশ জমে উঠেছে ততক্ষণে। সব বিভাগগুলোতে অল্প স্বল্প ঢুঁ মেরে চলে এলাম জামালখানের নব্য খ্যাতি পাওয়া খাবারের দোকানে। লাচ্ছি খেয়ে টেয়ে শক্তি সঞ্চয় করে হাঁটা ধরলাম চকবাজারের চিরচেনা রাস্তাটা ধরে; সবুজে ছাওয়া ব্যস্ত রাস্তা। বহুবছরেও বদলেছে খুব কমই৷ বহুকষ্টে ঢোকার ইচ্ছা দমন করে কলেজগুলো পার হলাম। চকবাজারের মোড়ে গিয়ে চট্টেশ্বরী রাস্তার দিকে যেতে মন চাইলো। কিন্তু আবার ক্লান্তি ভর করায় রিক্সা নিলাম। এটাও আমার আরেকটা পছন্দের রাস্তা। ভিষণ ব্যস্ত দিনেও এই রাস্তাটায় ভিড় জমে না। কারণ এই পথে লোকাল গাড়ির যাতায়াত নেই। তাই ফাঁকা রাস্তা পেয়ে আবারও শীতের বাতাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চললাম আমরা।
ওয়ার সেমিট্রি নামলাম এবং সবসময়কার মতো আশাভঙ্গ হলাম। ওটা বন্ধ। শেষ খোলা দেখেছি (আমি ব্যক্তিগতভাবে) ২০১৮ সালে। তাও ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে সময় শেষ বলে। যাকগে, তারপর কোন রাস্তা ধরে আমার জানা নেই, আমরা গোলপাহাড় পৌঁছে গেলাম। সেখান থেকে জিইসি। তখন দুপুর ১টা পেরিয়েছে৷ এই ছয়-ছয়টা ঘণ্টা— লম্বা কি ছোট সময় বলতে পারছি না, বিভিন্ন ভ্রমণের দরুন এমন লম্বা হাঁটা আমার জন্য তেমনকিছু না, কিন্তু নিজ শহরে এই-ই ছিল প্রথম৷ আর সত্যি বলতে ক্লান্ত হইনি মোটেই৷ এ শহরের যে এত রূপ, এত ঐশ্বর্য, তার এত স্নিগ্ধতা আর এত বৈচিত্র, তা এভাবে না দেখলে কখনো জানা হোতো না।
এবার শেষটা না বললেই নয়। এই যে আবিষ্কারের নেশায় এমন মেতে উঠেছি, পেটে দানা-পানি পড়েনি কিছু। তাই খুঁজে পেতে চলে গেলাম ওয়্যারলেসের মেম্বার হোটেলে। এর কথা কেন বিশেষভাবে উল্লেখ করছি? বহু ভাল রেস্তোরাঁ, পাঁচতারা হোটেল আছে। কিন্তু শান্তিমতো চারটা সাদা ভাত খাবেন, সাথে নানানরকম (মানে কতরকম, বলার বাহিরে) ভর্তা, মাছ বা এমনসব পদ থাকুক, এমন যদি চান, সাথে ভাল খাতির যত্ন, তবে এই হোটেলটা সেরা।
তো এরই সাথে খাওয়া দাওয়া সেরে দুপুর ২টায় যার যার ব্যস্ত দিন শুরু করতে বেরিয়ে পড়লাম সেদিনকার মতো।
সেখানটা পুরো ঘুরে শেষে কদমতলী দিয়ে বেরোলাম। এত কাছে এসে আমার চিরচেনা নস্টালজিয়ায় ভরপুর স্টেশনে যাব না, এ হতে পারে না। বহু-বহুদিন যাবত ট্রেনে চেপে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়া হয় না। একটা সময়ের ব্যস্তসমস্ত জায়গাটা আজ নিস্তব্ধ পড়ে আছে৷ সে সকাল বলে নয়। করোনার প্রকোপে।
বটতলী স্টেশন দিয়ে ঢুকে নতুন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসলাম অবশেষে৷ এই বসায় প্রথমবারের মতো খেয়াল হল অনেকটা পথ হেঁটে নিয়েছি আমরা! শরীর ছেড়ে দিল একেবারে৷ নির্বাক বসে রইলাম।
অপেক্ষমান ট্রেন নেই, যখন তখন মাইকিং নেই, ব্যাগ হিঁচড়ে দৌড়ানো মানুষ নেই। শুধু আছে থম ধরা কুয়াশা, তাকে সরিয়ে তার ফাঁক গলে উঁকি দেয়া সোনালী সূর্য আর ঠান্ডা হিরহিরে বাতাস, যা কিনা জোড় চেষ্টা চালাচ্ছিল আমাদের জমিয়ে দেওয়ার; কিন্তু এই এতটা পথ হাঁটা পথিকের কাছে তার হার না মেনে উপায় ছিল না।
এরমধ্যে খাওয়ার কথা কারো আর মাথায় আসেনি; সকালের ব্যাপারটাই আলাদা কিনা। স্টেশন থেকে বেরিয়ে নিউ মার্কেট এলাকার একটা দোকান থেকে তাই কিছু খাবার কিনে নিলাম। এবার উদ্দেশ্য কর্ণফুলীর পাড়ে যাওয়া। ততক্ষণে রোদ উঠে গেছে পুরোদমে। অভয়মিত্র ঘাট পৌঁছে বসলাম। ধু-ধু বালু চারদিকে। একেকটা গাড়ি যাচ্ছে আর আমাদেরকে রাঙিয়ে, খাইয়ে ভরপুর করে তুলছে। যতদ্রুত সম্ভব পথটা পেরিয়ে পাকা ঘাটে গেলাম। তার অবস্থাও খুব একটা মনোরম নয়, তবে রাস্তার আদর-আপ্যায়নের চেয়ে ভাল।
মানুষজন তেমন একটা নেই। জাহাজ কিছু ভিড়ে আছে, দুয়েকজন মাঝি নৌকা নামিয়েছে। আমাদের দিককার ঘাটে কেউ নেই; যেহেতু এটা আনন্দভ্রমণের সময় নয়!
শুধু খাওয়ার সময়টুকু কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঠাঁ-ঠাঁ রোদ তখন। এবার বেরিয়ে হাঁটায় বিরতি দিলাম। রিক্সা নিয়ে চলে গেলাম চেরাগি পাহাড় মোড়ে। উদ্দেশ্য চট্টগ্রামে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, আমার দ্বিতীয় বাড়ি বাতিঘরে যাব। লোকজনে বেশ জমে উঠেছে ততক্ষণে। সব বিভাগগুলোতে অল্প স্বল্প ঢুঁ মেরে চলে এলাম জামালখানের নব্য খ্যাতি পাওয়া খাবারের দোকানে। লাচ্ছি খেয়ে টেয়ে শক্তি সঞ্চয় করে হাঁটা ধরলাম চকবাজারের চিরচেনা রাস্তাটা ধরে; সবুজে ছাওয়া ব্যস্ত রাস্তা। বহুবছরেও বদলেছে খুব কমই৷ বহুকষ্টে ঢোকার ইচ্ছা দমন করে কলেজগুলো পার হলাম। চকবাজারের মোড়ে গিয়ে চট্টেশ্বরী রাস্তার দিকে যেতে মন চাইলো। কিন্তু আবার ক্লান্তি ভর করায় রিক্সা নিলাম। এটাও আমার আরেকটা পছন্দের রাস্তা। ভিষণ ব্যস্ত দিনেও এই রাস্তাটায় ভিড় জমে না। কারণ এই পথে লোকাল গাড়ির যাতায়াত নেই। তাই ফাঁকা রাস্তা পেয়ে আবারও শীতের বাতাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চললাম আমরা।
ওয়ার সেমিট্রি নামলাম এবং সবসময়কার মতো আশাভঙ্গ হলাম। ওটা বন্ধ। শেষ খোলা দেখেছি (আমি ব্যক্তিগতভাবে) ২০১৮ সালে। তাও ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে সময় শেষ বলে। যাকগে, তারপর কোন রাস্তা ধরে আমার জানা নেই, আমরা গোলপাহাড় পৌঁছে গেলাম। সেখান থেকে জিইসি। তখন দুপুর ১টা পেরিয়েছে৷ এই ছয়-ছয়টা ঘণ্টা— লম্বা কি ছোট সময় বলতে পারছি না, বিভিন্ন ভ্রমণের দরুন এমন লম্বা হাঁটা আমার জন্য তেমনকিছু না, কিন্তু নিজ শহরে এই-ই ছিল প্রথম৷ আর সত্যি বলতে ক্লান্ত হইনি মোটেই৷ এ শহরের যে এত রূপ, এত ঐশ্বর্য, তার এত স্নিগ্ধতা আর এত বৈচিত্র, তা এভাবে না দেখলে কখনো জানা হোতো না।
এবার শেষটা না বললেই নয়। এই যে আবিষ্কারের নেশায় এমন মেতে উঠেছি, পেটে দানা-পানি পড়েনি কিছু। তাই খুঁজে পেতে চলে গেলাম ওয়্যারলেসের মেম্বার হোটেলে। এর কথা কেন বিশেষভাবে উল্লেখ করছি? বহু ভাল রেস্তোরাঁ, পাঁচতারা হোটেল আছে। কিন্তু শান্তিমতো চারটা সাদা ভাত খাবেন, সাথে নানানরকম (মানে কতরকম, বলার বাহিরে) ভর্তা, মাছ বা এমনসব পদ থাকুক, এমন যদি চান, সাথে ভাল খাতির যত্ন, তবে এই হোটেলটা সেরা।
তো এরই সাথে খাওয়া দাওয়া সেরে দুপুর ২টায় যার যার ব্যস্ত দিন শুরু করতে বেরিয়ে পড়লাম সেদিনকার মতো।






বেশ তো! 😃
উত্তরমুছুনধন্যবাদ!
মুছুনবাহ, সুন্দর!
উত্তরমুছুন