গুলিয়াখালি সী বিচ ভ্রমণ ও কিভাবে যাওয়া যায়

গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত

গুলিয়াখালী কী আসলেই এমন সুন্দর, যেমনটা ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা যায়? নাকি সবই এডিটিং -এর কারসাজি?— এই প্রশ্ন আলোচনার খুবই প্রচলিত একটা বিষয়বস্তু। যাহোক, আমি সে আলোচনায় না গিয়ে আমার কথা বলি। অনলাইন-অফলাইন এর রিভিউ–ছবি, এসব কিছুর তোয়াক্কা না করেই গেছি এবার; শুধু নিজের মতো একটু অলস সময় কাটাতে। আর ফিরতিতে পেয়েছি তার চেয়ে ঢের ঢের বেশি কিছু। সে আলোচনায় পরে আসছি। আগে বলে নিই, গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত যাওয়ার উপায়।


চট্টগ্রাম সদর থেকে সীতাকুণ্ড সরাসরি যাওয়ার উপায় নেই। কম সময়ে পৌঁছাবার জন্য আমরা দুপুর ১:৩০ -এ জিইসির মোড় থেকে টেম্পুতে চড়ে রওনা দেই৷ শেষ স্টপেজ এ.কে. খান মোড়ে নেমে রাস্তা পাড় হলাম। সেখানে সীতাকুণ্ড যাওয়ার সরাসরি বাসে উঠে পড়লাম৷ এখানে উল্লেখ্য, করোনাকালীন প্রভাবে বাস-টেম্পুতে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে যেতে হয়েছে। জনপ্রতি টেম্পুতে ২০ ও বাসে ৫০ টাকা করে নিয়েছে।


সীতাকুণ্ড বাজারে গিয়ে নামলাম ঠিক ২:৫০ এ। বাস স্টপেজেই একটা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলে সিএনজি পাওয়া যায়। লোকাল-রিজার্ভ দুরকম ব্যবস্থাই চালু আছে। রিজার্ভে ১৫০ টাকায় সরাসরি গুলিয়াখালী সৈকতে গেছি আমরা৷ একই সিএনজিতে এলে মোটমাট ৩০০ টাকা। তবে রিজার্ভ করে রাখার প্রয়োজন হয় না। ফিরে যাবার সময় যথেষ্ট সিএনজি থাকে।

মাসটা যেহেতু জৈষ্ঠ্য, সিএনজি থেকে নেমেই আমরা গুলিয়াখালীর সবুজ ঘাসে ভরা সৈকতের দেখা পাইনি। ছিল মেঠো রাস্তা আর দুপাশে খোলা জমি; সেখানেই ঘাটে ট্রলার রাখা। ট্রলারে করে পেরিয়ে যেতে হবে খালভরা জোয়ারের পানি। জনপ্রতি ভাড়া ৩০ টাকা। এখানে উল্লেখ্য, গুলিয়াখালী পৌঁছানোর পর টেক্সি, ট্রলার এসবের ভাড়া করোনার প্রভাবে দ্বিগুণ হয়নি। এর ভাড়া সবসময়ই এমন।


সমুদ্রে ভরা জোয়ার
বেড়ানোর জন্য অফ ডে বলে মানুষ ছিল কম। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর যথেষ্ট যাত্রী পেলে ট্রলার ছাড়লো। তুমুল ঘটঘট আওয়াজ তুলে পানি কেটে ১০ মিনিটের মাথায় গিয়ে পৌঁছালাম গুলিয়াখালী সৈকতে। নেমেই প্রতিযোগিতা লাগিয়ে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়লাম। লাফিয়ে, পা টিপে হেঁটে ঘাসে ছাওয়া খাদ ডিঙিয়ে চলে গেলাম পাড়ে; যেখানে এখন তখন ঢেউ এসে ঝাপিয়ে পড়ছে৷


অন্যান্য সৈকতের মতো এর পাড় বালুকাময় নয়। ঘাসে ছাওয়া নয়নাভিরাম প্রকৃতি। পরিবেশটা অনেকটা সোয়াম ফরেস্ট ও ম্যানগ্রোভ বনের একটা মিশ্র বনের মতো। ঘাসে ঢাকা এলোমেলো খাদের পাড়েই এসে আছড়ে পড়ে ঢেউ। খাদ-নালাগুলো জোয়ারের সময় পানিতে ভরে উঠে। আমরা যখন গিয়েছি, তখন পানিতে ভরেই ছিল খাদগুলো। জোয়ারের সাথে সাথে আরও পেছাতে হলো আমাদের।


দিনটা ছিল রৌদ্রজ্জ্বল৷ তার সাথে সমুদ্রের এলোমেলো আর্দ্র বাতাস। রবিবার হওয়ার ফলে ভিড়ভাট্টা হয় নি৷ মুক্ত প্রান্তরে কেউ আয়েশ করে বসে আছে, কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে। লাফিয়ে, তিড়িং বিড়িং করে, হাসি ঠাট্টা আর গাদা গাদা ছবি তুলে আমাদের সময় পেরিয়ে যেতে লাগলো। ততক্ষণে ভুলেই বসে আছি এই জায়গায় আমাদের বড্ড বেমানান দলটার কথা।

দলটা মেয়েদের বলে আসার পথে পদে পদে আমরা অযাচিত শুভাকাঙ্ক্ষীর দেখা পেয়েছি। সাবধানবাণীর তোড়ে মনোবল ভাঙার যোগাড় হয়েছে। ঠিকমতো আজ বাসায় ফিরতে পারব কি-না, এই চিন্তাও মাথায় না এসে পারে নি।


কিন্ত এসব নিয়ে একটি কথাও উচ্চারণ করিনি আমরা৷ বরং ভয়ে গুটিয়ে না গিয়ে নিজেকে মেলে দিয়েছি। বর্তমানকে উপভোগ করার চেষ্টা করেছি। মুক্ত পাখির মতো ফিরে বেরাবার সেই সময়টাতে আমরা আর কোনো বিশেষ শুভাকাঙ্ক্ষীর দেখা পাইনি। সেখানে আসা সবাই যে যার মতো উপভোগ করে চলেছে সময়টাকে। কারো দিকে অযথা তাকিয়ে নিজের ব্যক্তিগত সময় কাটানোয় বিঘ্ন ঘটাবার ফুরসত কারো ছিল না। সেই জায়গাটাই এমন। এতক্ষণ থেকেও, একমুহূর্তের জন্য বিশ্রাম না নিয়েও ক্লান্ত হইনি। বরং সূর্য ম্লান হয়ে এলে মনে এক রাশ তৃষ্ণা নিয়ে আর খুব শীঘ্রই আবার ফিরে আসব— কথা দিয়ে ভাটার সময়ের শেষ ট্রলারে চড়ে ফিরে এসেছি। গোলাপী আভায় ভরে উঠেছে তখন চারদিকটা। ফিরতে মন চাইছিল না বটে, কিন্তু পাড়ে ভিড়বার পর বুঝলাম এই ট্রলারে না ফিরলে কপালে খুব দুঃখ ছিল। আমরা নামার পর পানি সরে গিয়ে কাদা কাদা হয়ে গেছে পুরো জায়গাটা৷ আমাদের ট্রলারটাই কম পানির কারণে আটকে গেছিল কয়েকবার। আর দেরি হলে এই কাদা মাড়িয়েই হাঁটু ডুবিয়ে হেঁটে আসতে হতো। এখানেই টই-টুম্বুর পানিতে আমদের ট্রলার বাধা ছিল, ভাবতে অবাক লাগে।



মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ